
সর্বজনীন পেনশনে বড় পরিবর্তনের উদ্যোগপ
সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচিকে আরও আকর্ষণীয় ও জনবান্ধব করতে একাধিক নতুন সুবিধা যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বিদ্যমান ৬০ বছরের পরিবর্তে ৫৫ বছর বয়স থেকেই পেনশন দেওয়ার প্রস্তাব, নির্দিষ্ট শর্তে জমা অর্থ তুলে কর্মসূচি থেকে বের হওয়ার সুযোগ, পেনশনারের মৃত্যুর পর তাঁর স্বামী বা স্ত্রীকে দীর্ঘমেয়াদি পেনশন সুবিধা, স্বাস্থ্যবীমা এবং শরিয়াহভিত্তিক পেনশন ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব রয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের চতুর্থ বৈঠকে এসব প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকে সভাপতিত্ব করার কথা অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এবং জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর। প্রস্তাবগুলো অনুমোদন পেলে পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় বিধিমালা ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
৬০ নয়, ৫৫ বছর বয়সে পেনশনের প্রস্তাব
বর্তমান নিয়মে সাধারণভাবে ৬০ বছর বয়স পূর্ণ হলে সর্বজনীন পেনশন থেকে মাসিক পেনশন পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। নতুন প্রস্তাবে পেনশন পাওয়ার বয়সসীমা কমিয়ে ৫৫ বছর করার কথা বলা হয়েছে। এতে পেনশন পাওয়ার জন্য নির্ধারিত বয়স পর্যন্ত অপেক্ষার সময় পাঁচ বছর কমতে পারে। তবে এ প্রস্তাব এখনো চূড়ান্তভাবে কার্যকর হয়নি।
পাঁচ বছর পর বিশেষ পরিস্থিতিতে টাকা তোলার সুযোগ
বর্তমান ব্যবস্থায় একবার সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচিতে যুক্ত হওয়ার পর মাঝপথে বের হওয়ার সুযোগ সীমিত। নতুন প্রস্তাবে অন্তত পাঁচ বছর চাঁদা দেওয়ার পর কেউ শারীরিক বা আর্থিকভাবে চাঁদা চালিয়ে যেতে অক্ষম হলে বিশেষ বিবেচনায় জমা অর্থ তুলে কর্মসূচি থেকে বের হওয়ার সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
তবে কোন পরিস্থিতিকে অক্ষমতা হিসেবে বিবেচনা করা হবে, কত টাকা ফেরত দেওয়া হবে এবং মুনাফার হিসাব কীভাবে হবে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত নীতিমালা চূড়ান্ত হওয়ার বিষয় রয়েছে।
পেনশনারের মৃত্যুর পর স্বামী-স্ত্রীর জন্য সুবিধা
বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, কোনো পেনশনার ৭৫ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগে মারা গেলে তাঁর নমিনি পেনশনারের ৭৫ বছর বয়স পর্যন্ত অবশিষ্ট সময়ের জন্য পেনশন পান। জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নতুন প্রস্তাবে এ ব্যবস্থায় পরিবর্তন এনে পেনশনারের স্বামী বা স্ত্রীকে দীর্ঘমেয়াদি/আজীবন পেনশন দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
তবে আজকের বিভিন্ন প্রতিবেদনে এ বিষয়ে কিছু পার্থক্য রয়েছে। কর্তৃপক্ষের পরবর্তী ব্যাখ্যায় স্পাউসের পেনশন পাওয়ার বয়সসীমা ৮০ বছর পর্যন্ত করার সিদ্ধান্তের কথাও এসেছে। ফলে চূড়ান্ত বিধিমালা প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত এ সুবিধার সুনির্দিষ্ট মেয়াদ নিয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
চালু হতে পারে ইসলামী পেনশন ব্যবস্থা
সর্বজনীন পেনশনে শরিয়াহভিত্তিক একটি পৃথক ‘ইসলামী উইন্ডো’ চালুর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। প্রচলিত বিনিয়োগ কাঠামোর বাইরে শরিয়াহসম্মত ব্যবস্থায় অংশ নিতে আগ্রহীদের সর্বজনীন পেনশনের আওতায় আনার লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ বিবেচনা করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্যবীমা যুক্ত করার পরিকল্পনা
পেনশন গ্রাহকদের জন্য স্বাস্থ্যবীমা চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। এ বিষয়ে একটি খসড়া পরিকল্পনা তৈরি করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় গ্রাহকের কাছ থেকে মাসে প্রায় ১০ থেকে ২০ টাকা প্রিমিয়াম নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
তিন বছরে নিবন্ধন প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার
সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচি চালু হয় ২০২৩ সালের ১৭ আগস্ট। বর্তমানে এর আওতায় প্রগতি, সুরক্ষা, সমতা ও প্রবাস—এই চারটি স্কিম চালু রয়েছে।
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় তিন বছর পর চারটি স্কিমে নিবন্ধিত গ্রাহকের সংখ্যা ৩ লাখ ৭৯ হাজার ৯২০ জনের মতো এবং তাঁদের জমা করা অর্থের পরিমাণ প্রায় ২৮৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা।
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ১৮ থেকে ৫০ বছর বয়সী বাংলাদেশি নাগরিকরা সাধারণভাবে সর্বজনীন পেনশন স্কিমে অংশ নিতে পারেন। বিশেষ ব্যবস্থায় ৫০ বছরের বেশি বয়সীরাও নির্দিষ্ট সময় চাঁদা দিয়ে পেনশন সুবিধা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
কেন পরিবর্তনের উদ্যোগ
সর্বজনীন পেনশন চালুর পর প্রত্যাশিত গতিতে অংশগ্রহণ না বাড়ার পেছনে ব্যাংকের আমানতের তুলনায় রিটার্ন, দীর্ঘ সময় চাঁদা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা এবং পেনশন পাওয়ার আগে তাৎক্ষণিক সুবিধার সীমাবদ্ধতাকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
নতুন সুবিধাগুলো চালু হলে গ্রাহকদের জন্য কর্মসূচিটি আরও নমনীয় করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে অংশগ্রহণ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ। তবে প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়ন নির্ভর করবে পর্ষদের অনুমোদন এবং প্রয়োজনীয় বিধিমালা সংশোধনের ওপর।
অর্থাৎ, ৫৫ বছর বয়সে পেনশনসহ প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলো এখনো চূড়ান্তভাবে কার্যকর হয়নি। পর্ষদের সিদ্ধান্ত ও পরবর্তী বিধিমালা প্রকাশের পরই এসব সুবিধার সুনির্দিষ্ট শর্ত ও কার্যকর হওয়ার তারিখ নিশ্চিত হবে।

