আমাদের সন্তানরা নির্মল আনন্দে বেড়ে উঠছে না: ডিসি জাহিদ

admin
By admin
6 Min Read

আমাদের সন্তানরা নির্মল আনন্দে বেড়ে উঠছে না: ডিসি জাহিদ

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ

“আমরা সবাই এখন নিজের সন্তানকে ‘গোল্ডেন এ প্লাস’ পাওয়ানোর দৌড়ে ব্যস্ত। কিন্তু আমরা কি ভাবছি—আমার সন্তানটি প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠছে কি না? আমাদের সন্তানরা নির্মল আনন্দে বেড়ে উঠছে না। পরিবার ও সমাজ থেকে মানবিক সংযোগ হারিয়ে যাচ্ছে। শুধু চিকিৎসা নয়, অটিজম প্রতিরোধে সামাজিক সুস্থতাও জরুরি।”

আজ বুধবার ( ১৩ মে) চট্টগ্রামে বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় এসব কথা বলেছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।

“অটিজম কোনো সীমাবদ্ধতা নয়, প্রতিটি জীবন মূল্যবান” প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউস সম্মেলন কক্ষে জেলা প্রশাসন ও জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তর, চট্টগ্রামের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা ও অনুদান বিতরণ অনুষ্ঠান।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম বলেন, ১৯৪৩ সালে ডোনাল্ড গ্রে ট্রিপলেট নামে এক শিশুকে কেন্দ্র করে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ড. লিও কানার অটিজম নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। সেই গবেষণার মাধ্যমেই আধুনিক অটিজম ধারণার সূচনা হয়।

তিনি বলেন, “অটিজম” শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ “অটোস” থেকে, যার অর্থ নিজেকে কেন্দ্র করে থাকা। তবে আজ অটিজম শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিষয় নয়, এটি সামাজিক বাস্তবতারও অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জেলা প্রশাসক বলেন, “আমরা মঞ্চে যারা কথা বলি, আমরা পিছনের চিত্রটা তুলে ধরি না। দেশের ৯৮ লক্ষ অটিস্টিক শিশুদের পরিবারে যে কষ্ট, যে হাহাকার আছে, তা আড়ালেই থেকে যায়।”

তিনি বলেন, “আমরা স্টিফেন হকিংয়ের কথা শুনেছি, মাইকেল ফেলপসের কথা শুনেছি। হ্যারি পটার সিরিজের লেখক জে. কে. রাউলিংয়ের জীবনেও গভীর মানসিক সংকট ছিল। মানুষের মানসিক জগৎ, একাকিত্ব, গ্রহণ-বর্জনের প্রবণতা—এসব বিষয় নিয়েই আজকের অটিজম আলোচনার বিস্তৃতি।”

গতকাল চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে অটিজম ইউনিট পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জেলা প্রশাসক বলেন, “সেখানে অত্যন্ত বড় একটি অটিজম ইউনিট দেখেছি। দায়িত্বশীল চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানতে চেয়েছি—কেন অটিস্টিক শিশুর সংখ্যা বাড়ছে?”

তিনি জানান, চিকিৎসকদের মতে আগে শনাক্তকরণের সীমাবদ্ধতা থাকলেও এখন প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে বিষয়গুলো দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে। পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাস, পরিবেশ দূষণ, অল্প বয়সে মাতৃত্ব ও সামাজিক পরিবর্তনের বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এসেছে।

জেলা প্রশাসক বলেন, “একসময় ‘পরিজন’ শব্দটির গভীরতা ছিল। আজ আমরা পরিবারকেন্দ্রিক হলেও মানবিক সংযোগ হারিয়ে ফেলছি। আমরা সবাই ব্যস্ততার মধ্যে ডুবে আছি। জীবনের আনন্দ যেন হারিয়ে যাচ্ছে।”

তিনি বলেন, “আজ এখানে যারা এসেছেন, তারা অনেকেই সচেতন ও সচ্ছল পরিবারের প্রতিনিধি। কিন্তু এর বাইরেও অসংখ্য পরিবার আছে, যারা নীরবে সংগ্রাম করছে। তাদের কণ্ঠ আমরা কতটা শুনছি?”

নিজেদের দায়বদ্ধতার প্রসঙ্গ তুলে ধরে জেলা প্রশাসক বলেন, “আমরা প্রায়ই অন্যের ভুল নিয়ে কথা বলি, কিন্তু নিজের দায়িত্ব পালনের জায়গাটি ভুলে যাই। শুধু অন্যকে দোষারোপ করলে হবে না; প্রত্যেককে নিজের অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল হতে হবে।”

তিনি আরও বলেন, “একজন অসুস্থ মানুষ সুস্থ সমাজ গড়ে তুলতে পারে না। তাই আমাদের শুধু সহায়তা নয়, প্রতিরোধ নিয়েও ভাবতে হবে। আমরা কি এমন একটি সমাজ গড়ে তুলছি, যেখানে মানসিক সুস্থতা ও পারিবারিক বন্ধন শক্তিশালী থাকবে?”

পশ্চিমা সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক বলেন, “আমাদের সমাজ ব্যবস্থা ও ইউরোপ-আমেরিকার সমাজ ব্যবস্থা এক নয়। আমাদের সংস্কৃতি, পরিবার ও মূল্যবোধ আলাদা। পশ্চিমা আচরণ হুবহু অনুসরণ করলে সবসময় তা আমাদের সমাজে মানানসই হবে না।”

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ আমাদের মানুষ। প্রতিটা জীবন গুরুত্বপূর্ণ—Every Life Matters। এই জনগণকেই দক্ষ, যোগ্য ও মানবিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।”

মানবিক মূল্যবোধের গুরুত্ব তুলে ধরে জেলা প্রশাসক বলেন, “সূর্যের যদি তাপ না থাকে, তবে তার কোনো মূল্য নেই। সমুদ্রের যদি গর্জন না থাকে, তবে কেউ তার কাছে যাবে না। তেমনি মানুষের মধ্যে যদি মানবিকতা না থাকে, তবে সে ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ হওয়ার দাবি করতে পারে না।”

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্ধৃতি তুলে ধরে তিনি বলেন, “‘আমার সবচেয়ে বড় পরিচয়, আমি মানুষ।’ মানুষ হওয়ার জন্য মানবিকতা প্রয়োজন। বড়দের সম্মান করতে জানতে হবে, ছোটদের ভালোবাসতে জানতে হবে।”

জেলা প্রশাসক বলেন, “আমরা যদি এই মূল্যবোধ থেকে সরে যাই, তাহলে কাঙ্ক্ষিত সমাজ গঠন সম্ভব হবে না। বরং আমাদের নানা ধরনের সামাজিক ও মানসিক চ্যালেঞ্জ বহন করতে হবে। কাঁধে অতিরিক্ত বোঝা নিয়ে কেউ দ্রুত এগোতে পারে না।”

তিনি আরও বলেন, “আজকের পৃথিবী প্রযুক্তিনির্ভর ও আন্তঃসংযুক্ত। এই প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকতে হলে আমাদের সমাজের অস্থিরতা কমাতে হবে এবং মানবিক মূল্যবোধকে শক্তিশালী করতে হবে।”

অনুষ্ঠানে বিভাগীয় সমাজসেবা কার্যালয়ের পরিচালক মোহাম্মদ শহীদুল ইসলামের সভাপতিত্বে স্বাগত বক্তব্য রাখেন জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক। অটিজম বিষয়ে বিশেষ পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গাইনি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. ফাহমিদা ইসলাম চৌধুরী।

অনুষ্ঠানে বিশেষ বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শরীফ উদ্দিন, প্রয়াস-এর অধ্যক্ষ লে. কর্ণেল সাঈদা তাহমিনা সিমা, অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব জাফর আলম এবং অধ্যাপক ডা. বাসনা মুহুরী।

মীরসরাই উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা সাবরিনা রহমান লিনার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সমাজসেবা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. জসীম উদ্দিন, উর্বশী দেওয়ান, মো. শহীদ উল্লাহসহ প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা এবং নিবন্ধিত স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার প্রতিনিধিরা।

অনুষ্ঠানের অ বাংলাদেশ জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদ থেকে প্রাপ্ত এককালীন অনুদান বিতরণ করা হয়। এসময় চট্টগ্রামের ২৬ জন দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীর মাঝে জনপ্রতি ১০ হাজার টাকা করে অনুদানের চেক বিতরণ করা হয়।

অটিজম সচেতনতা বৃদ্ধিতে চট্টগ্রামের নিবন্ধিত স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলো অনুষ্ঠানে সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করে।

Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *