কম্যুনিস্ট আমলের গোপন নথি উন্মুক্ত করলো হাঙ্গেরি

admin
By admin
4 Min Read

৪৫ বছরের কম্যুনিস্ট শাসনের রাজনৈতিক আঘাত ও ট্রমা থেকে হাঙ্গেরিয়ান সমাজকে নিরাময়ের লক্ষ্যে কম্যুনিস্ট আমলের গোপন গোয়েন্দা ফাইলের তথ্য সাধারণ জনগণের জন্য উন্মুক্ত করেছে হাঙ্গেরি সরকার। হাঙ্গেরির রাজনীতিতে বহু বিতর্কিত ও ঐতিহাসিক এই পদক্ষেপকে সরকারের পক্ষ থেকে ইতিহাস থেকে পাঠ নেওয়ার এক সুযোগ বলা হলেও, সমালোচকদের মতে এই উদ্যোগ অনেক বিলম্বে নেওয়া হয়েছে।

তথ্যগুলো অসম্পূর্ণ হওয়ার কারণে তা সমাজে নতুন করে বিভাজন তৈরি করতে পারে এবং অনেক পরিবারকে অপ্রয়োজনীয় মানসিক কষ্টের মুখে ফেলতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন তাঁরা।

গোপন ফাইলগুলো উন্মুক্ত করার জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে ৪ নভেম্বর তারিখটিকে, যা দেশটির ইতিহাসে অত্যন্ত প্রতীকী এক দিন। ১৯৫৬ সালের এই দিনটিতেই সোভিয়েত ট্যাঙ্ক হাঙ্গেরির স্বল্পস্থায়ী বিপ্লবকে নির্মমভাবে দমন করতে বুদাপেস্টের রাজপথে নেমেছিল।


বুদাপেস্টের রাষ্ট্রীয় আর্কাইভে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী পিটার মাগিয়ার বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া থাকা এই দলিল প্রকাশের বিষয়টি সবাইকে দায়িত্বশীলতা ও মানবতার সঙ্গে গ্রহণ করার জন্য অনুরোধ করছি। অনেক পরিবারকেই তাদের প্রয়াত স্বজনদের সম্পর্কিত কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। তবে আলোচনা ও প্রশ্ন উত্থাপন ছাড়া কোনো ঐতিহাসিক ক্ষত থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।

গত এপ্রিলের নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের আগে দেওয়া মাগিয়ারের প্রধান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলোর অন্যতম ছিল এই গোপন ফাইল উন্মোচন করা। ১৯৮৯ সালে কম্যুনিস্ট শাসনের পতনের পর পরবর্তীতে রক্ষনশীল, সোশ্যাল-লিবারেল কিংবা ফিদেস নেতৃত্বাধীন বিভিন্ন সরকার বহুবার এই ফাইল প্রকাশের চিন্তা করলেও শেষ পর্যন্ত তা আটকে রেখেছিল।

১৯৯৮ সাল থেকে অবশ্য ব্যক্তি নিজের বা গবেষকরা অন্যদের ফাইল গবেষণার আবেদন করতে পারতেন, কিন্তু তাতে ব্ল্যাকআউট করা প্রচুর অংশ থাকত এবং অনেক নথি গোপন সংস্থাই রেখে দিত। এমনকি বহু ফাইল ১৯৮৮-৮৯ সালেই ধ্বংস করে ফেলা হয়েছিল এবং গত ৩৬ বছরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সুযোগ বুঝে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে সেই ফাইলের নানা অংশ প্রকাশ করে এসেছিল।

বুধবার থেকে সরকারের উদ্যোগে চালু হওয়া ‘nyitottaktak.hu’ ওয়েবসাইটে কম্যুনিস্ট আমলের গোপন গোয়েন্দা সংস্থায় সংগৃহীত প্রায় ৬০ হাজার তথ্যদাতার নাম ও ব্যক্তিগত পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। ফাইলগুলোতে তথ্যদাতার আসল নাম, ছদ্মনাম, জন্ম তারিখ, ঠিকানা, মায়ের নাম, নিয়োগের কারণ, তিনি কি স্বেচ্ছায় কাজ করেছিলেন নাকি ব্ল্যাকমেইল ও হুমকির শিকার হয়ে যুক্ত হয়েছিলেন এবং তাঁর হ্যান্ডলিং অফিসার বা নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তার নাম পর্যন্ত রেকর্ড করা রয়েছে।

আগামী ২৫ ফেব্রুয়ারি ‘বি-ডোসিয়ার’ নামের ফাইলের দ্বিতীয় কিস্তি ডিজিটালাইজড করে প্রকাশ করা হবে, যা থেকে তথ্যদাতারা কতটা মূল্যবান বা সাধারণ তথ্য সরবরাহ করতেন সে সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানা যাবে।


সমালোচকরা বলছেন, ফাইলের বিস্তারিত ও সূক্ষ্ম প্রেক্ষাপট না বুঝে সাধারণ মানুষ দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছে যেতে পারেন যা বিভ্রান্তিকর হতে পারে। হিসাব অনুযায়ী, ১৯৪৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯৯০ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত হাঙ্গেরিতে প্রায় দেড় লাখ থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার মানুষকে তথ্যদাতা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। এদের বড় অংশকেই চাকরি হারানো, লেখাপড়া বন্ধ করে দেওয়া, ওষুধ না পাওয়া বা যৌন জীবন ও মাদকের আসক্তির মতো ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস করার ভয় দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল করা হয়েছিল। তবে এসব একান্ত ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল বিষয় উন্মুক্ত নথি থেকে সাবধানে ছেঁটে ফেলা হয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে ফাইলের তথ্য উন্মুক্ত করার জন্য আন্দোলন করে আসা ইতিহাসবিদ ক্রিস্টিয়ান উংভারি বলেন, নাগরিকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র কী তথ্য জমা রেখেছে তা জানার অধিকার জনগণেরই থাকা উচিত এবং এটি ক্ষমতার শীর্ষে থাকা ব্যক্তিদের মর্জির ওপর নির্ভর করা উচিত নয়।

অন্যদিকে কট্টর ডানপন্থী ‘আওয়ার হোমল্যান্ড’ পার্টির আইনপ্রণেতা ও ইতিহাসবিদ জসুজানা বরভেন্দেগ মনে করেন, তথ্যদাতাদের নিয়োগের প্রেক্ষাপট ও তাঁদের কর্মকাণ্ড সঠিকভাবে না ব্যাখ্যা করে শুধু তালিকা প্রকাশ করাটা জনগণকে ভুল পথে চালিত করার চরম ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সংলাপ