মার্কিন রাজনীতিতে এক যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক অধ্যায় রচনা করেছেন ৪২ বছর বয়সী ডেমোক্র্যাট নেতা ড. আবদুল এল-সায়েদ। মিশিগান অঙ্গরাজ্যের অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সিনেট নির্বাচনে জয়লাভ করে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সেনেটর হিসেবে নির্বাচিত হবার গৌরব অর্জন করেছেন।
সাবেক এই পাবলিক হেলথ কর্মকর্তা ও মিশরীয় অভিবাসীর সন্তান তাঁর নির্বাচনী প্রচারণায় মূলত সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতের সংস্কারের ওপর জোর দেন। সেসঙ্গে নিজেকে ‘পুঁজিবাদী’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে সমাজতান্ত্রিক তকমা শক্তহাতে প্রত্যাখ্যান করেছেন তিনি।

রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সের সঙ্গে এই নির্বাচনী লড়াইটি মোটেও সহজ ছিল না। ৬৩ বছর বয়সী সাবেক কংগ্রেসম্যান ও এফবিআই এজেন্ট রজার্স সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জাতীয় রিপাবলিকান নেতৃত্বের শক্তিশালী সমর্থনে ময়দানে নেমেছিলেন।
ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রগতিশীল এই বিজয়ী প্রার্থীর বিরুদ্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ রিপাবলিকান শিবির চরম আক্রমণাত্মক অবস্থান নেয়। এল-সাঈদকে মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং ‘সন্ত্রাসীদের সহানুভুতিশীল’ হিসেবে চিহ্নিত করার অপচেষ্টা চালানো হয়, যার পেছনে ভিত্তিহীন ও বানোয়াট অভিযোগের পাহাড় তৈরি করা হয়েছিল।
এছাড়া বর্ণবাদী ও ইসলামোফোবিক নানা আক্রমণের শিকার হন তিনি। ডেমোক্র্যাটরা স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে, এল-সায়েদের বিরুদ্ধে চালানো এসব আক্রমণ সম্পূর্ণ কুৎসিত ও ইসলামবিদ্বেষী ট্রপের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। রজার্স বিশেষ করে মিশিগানের ইহুদি ভোটারদের নিজেদের পক্ষে টানার চেষ্টা করেছিলেন, যারা গাজায় ইসরায়েলি সামরিক পদক্ষেপে এল-সাঈদের কড়া সমালোচনা ও সামরিক সহায়তার বিরোধিতার বিষয়ে কিছুটা সন্দিহান ছিলেন। তবে অর্থনৈতিক সংকট ও ট্রাম্পের নিম্ন জনপ্রিয়তার মারপ্যাঁচে শেষ পর্যন্ত টিকতে পারেননি রজার্স।
বিজয়ের পর ডেট্রয়েটে দেওয়া তাঁর উদ্বোধনী বক্তব্যটি ছিল অত্যন্ত তেজস্বী এবং গতানুগতিক ঐক্য বা ঐকমত্যের বুলি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। প্রতিপক্ষ মাইক রজার্সের তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, মাইক রজার্স আমাদের প্রজন্মের অন্যতম কুৎসিত ও অপবিত্র একটি প্রচারণা চালিয়েছেন, যেখানে সরাসরি আমার ধর্মীয় বিশ্বাসকে টার্গেট করা হয়েছিল।”

উৎফুল্ল সমর্থক ও জনতার উদ্দেশে এল-সায়েদ আরও বলেন, আপনারা ঘৃণা বেছে নিয়েছিলেন, আর মিশিগান বেছে নিয়েছে আশা। তিনি অভিযোগ করেন, বিরোধীরা শুধু তাঁকেই ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করেনি, বরং তারা আক্রমণ করেছে স্বয়ং আমেরিকার মূল ধারণাকেই। যারা অন্যরকম দেখতে, ভিন্নভাবে প্রার্থনা করে কিংবা অন্য কোনো দেশ থেকে শিকড় গেড়েছে, এমন একটি বিশাল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আমেরিকাকে তারা সহ্য করতে পারে না, বলেন তিনি।
ট্রাম্পের বিখ্যাত ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ স্লোগানের কঠোর সমালোচনা করে এল-সায়েদ বলেন, আমেরিকার মহান হওয়ার জন্য অতীত যুগে ফিরে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই; বরং এর প্রকৃত মহত্ত্ব নিহিত রয়েছে একে প্রতিনিয়ত আরও নিখুঁত ও উন্নত করার অদম্য ইচ্ছার মধ্যে। আর বর্তমান সময়ে এর অর্থ হলো, আমেরিকার সাধারণ মানুষের জীবনকে পঙ্গু করে দেয়া অসাধু কর্পোরেশন, শতকোটিপতি এবং বিশেষ স্বার্থান্বেষী মহলকে শক্ত হাতে মোকাবিলা করা।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স-এনডিটিভি
