
আবু বক্কর সিদ্দিক, উখিয়া, কক্সবাজার।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তের শান্ত জনপদ উখিয়া আজ এক জটিল ও সংবেদনশীল ভূ-রাজনৈতিক সংকটের কেন্দ্রে।
একদিকে সুউচ্চ পাহাড় আর বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশির মিতালী, অন্যদিকে ১২ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থীর জনতাত্ত্বিক চাপ—এই দুইয়ের টানাপোড়েনে বিপন্ন হয়ে পড়ছে স্থানীয় পরিবেশ, সমাজ ও নিরাপত্তা।
সম্প্রতি এক বিশ্লেষণে উখিয়ার এই বহুমুখী সংকট ও আগামীর সম্ভাবনার চিত্র উঠে এসেছে, যা জাতীয় পর্যায়ে জরুরি নীতি-নির্ধারণী আলোচনার দাবি রাখে।
২০১৭ সালের পর থেকে উখিয়ার কুতুপালং ও বালুখালী এখন বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী শিবিরে রূপান্তরিত হয়েছে। এই বিশাল জনস্রোতের আবাসন নিশ্চিত করতে গিয়ে উখিয়ার প্রায় ৮ হাজার একর বনভূমি সম্পূর্ণ উজাড় করা হয়েছে।
উখিয়ার গহীন অরণ্য ছিল এশীয় বন্যহাতির প্রধান করিডোর। বন নিধনের ফলে হাতির চলাচলের পথ রুদ্ধ হয়ে যাওয়ায় লোকালয়ে হাতির আক্রমণ বেড়েছে, যা মানুষ ও বন্যপ্রাণীর মধ্যে চরম দ্বন্দ্ব তৈরি করেছে।
নির্বিচারে পাহাড় কেটে তাবু ও ঘর তৈরি করায় বর্ষাকালে ভয়াবহ ভূমিধসের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বন না থাকায় মাটির উপরিভাগের উর্বর অংশ ধুয়ে যাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদী বাস্তুসংস্থানিক বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
উখিয়ার স্থানীয় জনসংখ্যার চেয়ে এখন শরণার্থীর সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি। এর ফলে স্থানীয় অধিবাসীরা নিজ ভূমিতেই সংখ্যালঘু হয়ে পড়েছেন।
আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলোর (NGO/INGO) আধিক্যের কারণে এই অঞ্চলে বাড়ি ভাড়া, যাতায়াত ও নিত্যপণ্যের দাম আকাশচুম্বী। স্থানীয় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য এই জীবনযাত্রার ব্যয় এখন অসহনীয়।
মিয়ানমার সীমান্ত সংলগ্ন হওয়ায় উখিয়া এখন ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথ বা আইস পাচারের প্রধান ট্রানজিট পয়েন্ট। ক্যাম্পের অভ্যন্তরে অপরাধী চক্রের সক্রিয়তা ও কোন্দল স্থানীয় জনগণের জানমালের নিরাপত্তাকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলছে।
সম্ভাবনার ‘মুকুট’ হতে পারে উখিয়া
এত সংকটের মাঝেও উখিয়ার প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক সম্পদ একে দেশের অন্যতম সমৃদ্ধ অঞ্চলে পরিণত করার ক্ষমতা রাখে।
ইনানি সমুদ্র সৈকত ও বিশ্বের দীর্ঘতম মেরিন ড্রাইভ সড়ককে কেন্দ্র করে থাইল্যান্ড বা ভিয়েতনামের আদলে ‘ইকো-ট্যুরিজম’ জোন গড়ে তোলা সম্ভব। আধুনিক রিসোর্ট ও সাফারি পার্কের আধুনিকায়ন পর্যটন খাতে বিপ্লব আনতে পারে।
উপকূলে আধুনিক হিমাগার এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে শুঁটকি প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র স্থাপন করা গেলে এটি দেশের বড় একটি রপ্তানি খাত হতে পারে। এছাড়াও এখানকার মিষ্টি পান ও সুপারির বাণিজ্যিক বাজার তৈরির বিশাল সুযোগ রয়েছে।
উখিয়াকে এই খাদের কিনারা থেকে রক্ষা করতে কেবল ত্রাণ বা সাহায্য নয়, বরং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।
১. পরিবেশ ও সমাজ রক্ষায় রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনই একমাত্র স্থায়ী সমাধান।
২. উজাড় হওয়া বনভূমিতে দ্রুত সামাজিক বনায়ন এবং পাহাড় কাটা কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে।
৩. স্থানীয় শিক্ষিত তরুণদের পর্যটন ও কারিগরি শিক্ষায় বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
৪. সীমান্ত সুরক্ষা ও মাদক পাচার রোধে বিজিবি ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি আরও আধুনিকায়ন ও সাঁড়াশি অভিযান জোরদার করতে হবে।
উখিয়া কেবল একটি উপজেলা নয়, এটি বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক সাহসের প্রতীক। রোহিঙ্গা সংকটের আন্তর্জাতিক বোঝা একা উখিয়ার ওপর না ফেলে, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এই জনপদকে রক্ষা করাই এখন সময়ের দাবি।
মুহাম্মদ ফায়েজ, প্রাক্তন শিক্ষার্থী, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
