
নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (এনপিসিবিএল)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জাহেদুল হাসান জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) নির্দেশনা মেনে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ‘ডিফেন্স-ইন-ডেপথ’ বা বহুস্তরীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। এই ব্যবস্থায় একাধিক নিরাপত্তা স্তর একযোগে কাজ করে, যা কেন্দ্রটির সামগ্রিক নিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী করে। তিনি বলেন, কেন্দ্রটিতে আধুনিক ‘অ্যাকটিভ সেফটি সিস্টেম’ রয়েছে, যার মধ্যে স্বয়ংক্রিয় শাটডাউন এবং জরুরি কোর কুলিং ব্যবস্থা উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি রয়েছে ‘প্যাসিভ সেফটি সিস্টেম’, যা বিদ্যুৎ বা মানবীয় হস্তক্ষেপ ছাড়াই চুল্লিকে নিরাপদ রাখতে সক্ষম। এছাড়া ডাবল কনটেইনমেন্ট, কোর ক্যাচার, হাইড্রোজেন রিকম্বাইনারসহ বিভিন্ন আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তি সংযোজন করা হয়েছে, যা পুরোনো প্রযুক্তির তুলনায় অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য। মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) বিকেল সাড়ে ৩টার পর আনুষ্ঠানিকভাবে রূপপুরের প্রথম ইউনিটে ইউরেনিয়াম বা জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম শুরু হয়। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, করোনা মহামারি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধজনিত বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও সরকারের দৃঢ়তায় এই গুরুত্বপূর্ণ ধাপে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। আইএইএর কঠোর তদারকি এবং সব নিরাপত্তা শর্ত পূরণের পর গত ১৬ এপ্রিল জ্বালানি লোডিংয়ের অনুমোদন দেওয়া হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ এগোলে আগামী জুলাই বা আগস্টের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলকভাবে অন্তত ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এক বছর পর প্রথম ইউনিটটি পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে গেলে দেশ পাবে ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। তবে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে উৎপাদনের সময়সূচি কয়েক দফা পরিবর্তন করা হয়েছে। ২০১৭ সালে নির্মাণকাজ শুরুর সময় নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা এগিয়ে থাকলেও আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে সময়সীমা পুনর্নির্ধারণ করা হয়। সর্বশেষ পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে পূর্ণ সক্ষমতায় পৌঁছানোর লক্ষ্য রয়েছে। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ও প্রকল্পের সাবেক পরিচালক ড. শৌকত আকবর বলেন, অবকাঠামো নির্মাণ শেষে এখন প্রকল্পটি বিদ্যুৎ উৎপাদনের মূল ধাপে প্রবেশ করছে। ইউরেনিয়াম লোডিংয়ের মাধ্যমে ‘চেইন রিঅ্যাকশন’ শুরু হওয়াই বড় অর্জন, যা বিজ্ঞানের ভাষায় ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’ নামে পরিচিত। পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ফিজিক্স বিভাগের অধ্যাপক ড. প্রীতম কুমার দাসের মতে, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারমাণবিক বিদ্যুৎ গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না। আইএইএর প্রতিটি নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণ না করলে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই সময় নিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে তিনি ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন। বর্তমানে প্রকল্পটিতে প্রায় পাঁচ হাজার রুশ বিশেষজ্ঞ এবং ২০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী কাজ করছেন। একই সঙ্গে দক্ষ দেশীয় জনবল তৈরি করা হয়েছে এবং ধাপে ধাপে কেন্দ্রটির পরিচালনার দায়িত্ব বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞদের কাছে হস্তান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে।


